আজ সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনায় শিশু কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য

জিনাত আরা আহমেদ

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদূর্ভাবে বিশ^জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন সমস্যার। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি, পড়াশোনা সবকিছুতেই বিধিনিষেধের বেড়াজাল। মানুষের বসতি এই পৃথিবী নামক গ্রহ আজ ছয়মাস যাবৎ জীবন যাপনে স্বাভাবিকতা হারিয়েছে। প্রতিটি মানুষ ভাইরাস আতঙ্কে দিন পার করছে। শিশু, কিশোর, যুবক, বয়োবৃদ্ধ প্রত্যেকের জীবনেই ছন্দপতন। এমন দুুর্যোগে অনেক অভিভাবকই সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বিগ্ন।

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের সংক্রমন মোকাবেলায় নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সকলেই ঘরবন্দি। চলাফেরায় স্বাধীনতা নেই, তাই মনও অবরুদ্ধ। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে চায় মন। বড়রা সাবধানতা নিয়ে প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও শিশু কিশোররা ঘরেই দিন পার করছে। একটানা দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ, বন্ধুবান্ধবের সাথে বাস্তব যোগাযোগের সুযোগ নেই। ঘুরে বেড়ানো তো দুরের কথা সামান্য সময়ের জন্য বাইরে বের হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন একঘেয়েমি রুটিন। বাবা মায়ের সার্বক্ষণিক খেয়াল নিয়ন্ত্রিত জীবনে যেন আরও হাঁপিয়ে ওঠা। এমনিধারা নানান জটিলতায় কিশোর-কিশোরীদের মনোজগতের অস্বাভাবিকতা আশ্চর্যের কিছু নয়।

করোনার বর্তমান পরিস্থিতি সকলের জন্যই অবরুদ্ধ অবস্থা, যা সাধারণত কারাগারের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় পড়া মানুষের অভিজ্ঞতার মত। দিনের পর দিন নির্দিষ্ট জায়গায় সঙ্গহীন কাটানোতে একধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই মানসিক চাপ মানসিক রোগকে উস্যকে দেয়। এক্ষেত্রে কারো যদি ত্র“টিপূর্ণ জিন থাকে তখন দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে থাকতে তার মধ্যে মানসিক রোগের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে করোনায় অবরুদ্ধ শিশু-কিশোরদের মাঝেও একঘেয়েমি, হতাশা, বিরক্তি থেকে নানা ধরনের মানসিক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা পারিবারিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। পারিবারিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ করে তুলতে এ মুহূর্তে অভিভাবকদের উচিৎ সন্তানদের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া।

নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা সামাজিক অনুষ্ঠান, বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা, হাসিঠাট্টা তাছাড়া মনের কথা বলা এসব আবেগ প্রকাশের মাধ্যমেই কিশোর-কিশোরীরা সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়ে ওঠে। এছাড়া খোলামেলা পরিবেশে বেড়াতে গেলেও মন ভাল থাকে। ভারসাম্যপূর্ণ এবং উপযুক্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে খোলামেলা পরিবেশের কোন বিকল্প নেই। অথচ বর্তমানে কারোরই ঘরের বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়। এভাবে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার ফলে পরিবারে নানা ধরনের অশান্তি লক্ষ্য করা যাচেছ। বিশেষত: শিশু-কিশোরদের মনে যে নেতিবাচক ছাপ ফেলে যাচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া খুবই ক্ষতিকর।

করোনাকালের স্বেচ্ছা অবরোধ শিশুদের মনে অস্থিরতা, হতাশা, উদ্বিগ্নতাসহ নানাধরনের জটিলতা সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে অভিভাবকদের হতে হবে যথেষ্ট দায়িত্বশীল। সন্তানেরা এতদিন নির্দিষ্ট সময় স্কুলে বা কোচিংএ থাকত, আবার বাসাতেও নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। অন্যদিকে বাবা-মায়েরা চাকরি অথবা জীবিকার কারনে অনেকটা সময় বাইরে থাকতেন। কিন্তু এখন বেশির ভাগ পরিবারে বাবা-মায়েরা অনেক সময় পাচ্ছেন সন্তানদের সময় দেয়ার। এসময় ওদের নিয়ে ভাবতে হবে। কারন সময়টাকে কাজে লাগানোর এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত।

বর্তমান দূর্যোগকালীন যেকোন বিরূপ পরিস্থিতি সামলাতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিলে ভাল হয়। শিশু সাইকোলজি নিয়ে লেখা বই পড়া যেতে পারে, এতে ওদের মনের গতিপ্রকৃতি বোঝা সহজ হবে। ওদের একান্তভাবে সময় দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, ছোটরা বড়দের মনে ঢুকতে পারেনা কিন্তু বড়রা চাইলে ছোটদের মনের ভেতর ঢুকে ওদের সাথে একাত্ব হতে পারেন। তাই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে কাজ আমাদের ভাল সাথী।

প্রতিদিনের কাজের রুটিন ঠিক করে সবার কাজ ভাগ করে দিলে সময়টা ভাল কাটে। অধিকাংশক্ষেত্রে আমরা পরিবারের বিভিন্ন কাজে ছোটদেরকে সম্পৃক্ত করি না। ওরা ছোট তাই পারবেনা, আবার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে, এমনটা ভেবে কিছুই করতে দিইনা। বাসায় কাজের মানুষ থাকলেতো কথাই নেই, কাজ শুধু মা আর গৃহপরিচারিকাদের। এভাবে দেখতে দেখতে ওরা একসময় কাজকে ভয় পায়। কাজের ব্যপারে এক ধরনের জড়তা কাজ করে। যেমন আমি এটা পারিনা কিংবা ওসব আমার ভাল লাগেনা। অথচ কাজ জীবনকে কতটা অর্থপূর্ণ করে আর ভাল লাগায় মনকে ভরিয়ে দেয় এই বোধ তৈরি করে দিতে হবে ছোটবেলাতেই। ছোট ছোট এবং হালকা কাজ দিয়ে ওদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। মৌমাছিদের জীবনচক্র দেখুন, ওরা শিশুকালেই সন্তানদের ঘর পরিস্কার করতে আর ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে শেখায়। যোগ্যতা অনুযায়ী ওরা সবার কাজ ভাগ করে দেয়। কেউ কৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে শাস্তিও দেয়।

করোনার জীবনে ছেলেমেয়েদের আনন্দঘন সময় পার করতে বই অনেক বড় বন্ধু। শিশুদের বই পড়ায় অভ্যস্ত করে তোলার এটাই উপযুক্ত সময়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি আর প্রতিযোগিতার আবর্তে পড়া কিশোর-কিশোরীরা সত্যিকারের জীবনবোধ থেকে বঞ্চিত। ভাল রেজাল্ট করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য মানসিক স্থিরতা প্রয়োজন। এতদিন শুধু পাঠ্যবই আর পরীক্ষায় প্রতিযোগিতার যা-তাকলে ওদের ভাবার অবকাশ ছিলনা। বই পড়ার অভ্যাস ওদের ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করবে। নতুন নতুন চিন্তা, সঠিক পরামর্শ আর জ্ঞানের দুয়ার খুলে দিতে ভাল বই এর কোন বিকল্প নেই। সন্তানদের পাশে নিয়ে ওদের সাথে আপনিও পড়তে থাকুন। কিছুদিনের মধ্যেই টের পাবেন বই এর আকর্ষণ ওর বন্ধুর অভাব অনেকটা ভুলিয়ে দিতে পারছে।

শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর সহানুভূতি পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় বাবা-মায়েরা সন্তানদের এই মূল্যবোধ দেবার সুযোগ কমই পেয়েছেন। করোনা পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে আগে। ওদেরকে শেখাতে হবে নিজের প্রতি যত্নবান হতে। বাবা-মাকে কাজে সাহায্য করা, নিজের কাজ নিজে করা, বাড়িতে গাছ থাকলে পরিচর্যায় সময় দেয়া এগুলোতে মন ভাল হয়। অভিভাবকদের উচিৎ ধৈর্যের সাথে সন্তানদের বেশি বেশি সময় দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করা, এতে ওদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। পরবর্তিতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ওরা সুস্থ মানসিকতার ভারসাম্যপূর্ণ এবং যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠবে।

লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সংশ্লিষ্ঠ আরো সংবাদ

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৫৭,৫৪৭
সুস্থ
১৪৮,৩৭২
মৃত্যু
৩,৩৯৯
সূত্র: আইইডিসিআর

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৪৮৭
সুস্থ
১,৭৬৬
মৃত্যু
৩৪
স্পন্সর: একতা হোস্ট