আজ শুক্রবার, ৭ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

দাকোপে দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় বড় বসুনদীয়া খাল

আজিজুর রহমান, দাকোপ থেকে ফিরে :
ইজারার জমি দাবি করে একজন ব্যক্তি সরকারি খালের পশ্চিম পাশ ভরাট দিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বাড়ির নিচ থেকে প্রায় ৮০ শতক জায়গা দখলে নিয়ে খালের ভিতরে বেড়িবাঁধ দিয়ে মাছচাষের ঘেরও করেছেন। এভাবেই দখলের কারণে মৃতপ্রায় খুলনার দাকোপ উপজেলার বড় বসুনদীয়া খাল।

জলকপাট নির্মাণ না করে খালের দুই মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় খালটি বদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে ফেলা হচ্ছে উপজেলার বারুইখালী গ্রামের ময়লা-আবর্জনা ও জীবজন্তুর মরদেহ। পানির মধ্যে এসব পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বসুনদীয়া পাড়াময়। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে খাল পাড়ের মানুষের। নিদির্ষ্ট স্থানে জলকপাট বা স্লুইসগেট নির্মাণ না করায় পানির প্রবাহ না থাকায় পলি জমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর বর্ষাকালে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। ফলে কৃষিকাজে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় চাষিরা।

ইজারা নিয়ে দখল আছেন বারুইখালী দক্ষিণপাড়া গ্রামের দীপঙ্কর বিশ্বাস নামের একজন বাসিন্দা। তিনি দাবি করে জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রতিবছর জমিরকরের টাকা পরিশোধ করে বসবাস করছেন। এছাড়া একবছর খাস খাল হিসেবে জলমহলের নির্ধারীত টাকা জমা দিয়ে মাছচাষের জন্য ইজারা নেন। অভিযোগ রয়েছে মেয়াদ উর্ত্তীণ হলেও খাল উন্মুক্ত না রেখে বেড়িবাঁধ দিয়ে দখলে রেখেছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাল দখলমুক্ত রাখার জন্য তাঁকে নোটিশ করা হয়েছিল।

দখলের বিষয় জানতে চাইলে দীপঙ্কর বিশ্বাস বলেন, ‘প্রায় ২৫ বছর ধরে এ খালপাড়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছি। খালের পাশে তার নিজের সম্পত্তি আছে দাবি করে বলেন সবাই যেমন দখল করে ঘরবাড়ি ও পুকুর খনন করে রেখেছে সঙ্গে আমিও রয়েছি। এখন যদি প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আমার জায়গা বাদ রেখে সরকারি খালের জায়গা সবাই ছেড়ে দিলে আমিও দিবো। তিনি আরও বলেন, খাল সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে তাঁর নামে আদালতে মামলা চলমান আছে।’

দীপঙ্কর বিশ্বাসের মতো প্রায় ৪০ জন ব্যক্তির অবৈধ দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বারুইখালী দক্ষিণপাড়া গ্রামের বড় বসুনদীয়া খালটি। ওই এলাকার পানিনিষ্কাশনের একমাত্র পথ এই খাল। কিন্তু খালটি রক্ষায় প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকায় সেই পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা সদরের দাকোপ খেয়াঘাট এলাকায় ঢাকি নদী থেকে খালটির শুরু। খালের উৎসমুখে ওয়াপদার রাস্তার দেওয়া। রাস্তার পাশ থেকে খালের উৎসমুখ বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে দখলদাররা। খালের ডান পাশ ধরে এগাতে থাকলে চোখে পড়ে খালের ভিতরে সরু-সরু বেড়িবাঁধ দিয়ে পুকুর খনন করা। কোথাও আবার স্থাপনা নির্মাণ করে রেখেছে। এ কারণে এসব স্থানে খাল সরু হয়ে গেছে।

বারুইখালী এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঢাকি নদীর একটি শাখাখাল এটি। ঢাকি নদী থেকে বারুইখালী দক্ষিণপাড়া হয়ে খোনা এলাকা পর্যন্ত খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় দুই কিলোমিটার। পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও খালটিতে ধরা পড়ত ছোট-বড় অনেক মাছ। কিন্তু দখল আর দূষণের কারণে মাছ তো দূরের কথা, ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে খালটি। খালের দুই পারের মানুষ এর পানি দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার করতে পারত। এখন দূষণের কারণে সেভাবে পানিও ব্যবহার করতে পারছে না। খালের পাশেই বাড়ি ৪৬ বছর বয়সী গৌরঙ্গ মণ্ডলের। তিনি বলেন, ‘আমার জন্মই এ এলাকায়। এই খালে ছিল খরস্রোত। বছরজুড়ে খালে পানি থাকত সঙ্গে প্রবাহিত হতো।

অনেকেই মাছ শিকার করেও জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গত সাত থেকে আট বছর ধরে এই খাল হারিয়ে যাচ্ছে। খালটি অনেক বড় ছিল। প্রায় বছরছয়েক আগে সরকারিভাবে ইজারা দিতেন। কিন্তু এখন আর সেই ইজারার কার্যক্রমও নেই। ক্রমেই খালটি বিভিন্ন জায়গায় সরু হয়ে যাচ্ছে। যার যখন প্রয়োজন, তখন তিনি খালটিকে অবৈধভাবে ব্যবহার করছেন।’ গৌরঙ্গ মণ্ডল বলেন, ‘আমরা সারা জীবন দেখলাম, সেটি একটা খাল। হঠাৎ করে নিজের জমি দাবি করে সেখানে ঘর নির্মাণ ও পুকুর খনন করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদও করেন না। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তার বিপদ চলে আসবে।’

খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বারুইখালী দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা রিংকু কুমার বাইন। তিনি বলেন, দখলমুক্ত করে খালটি খনন করলে এলাকার কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে। সারা বছর খালের পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা নতুন নতুন জাতের ফসল চাষ করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে খালটি খননের পদক্ষেপ নিলে খালের জায়গা ছেড়ে দিবো। রিংকুরমত অনেকেই খালটি দখলমুক্ত করে খননের দাবি জানান।

পানখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আনন্দ মোহন সরদার খুলনা মেইলকে বলেন, এক সময় বড় বসুনদীয়া খালে খরস্রোত ছিল। এলাকার মানুষ খালের পানি ব্যবহার করতেন। তারপর ১৯৬৯ সালে খালের দুই মাথায় বাঁধ দেয়া হয়। সেই থেকে খাল প্রাণ হারাতে শুরু করে। এরপর দখলদাররা নিজেদের সম্পত্তি ভেবে ইচ্ছেমত বেড়িবাঁধ ও ভরাট করে দখলে নেয়। খালে কচুরিপানা ও বিভিন্ন বর্জ্য ফেলার কারণে জলাবন্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্জ্যরে দুর্গন্ধে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। তিনি খাল খননের দাবি জানিয়ে আরও বলেন, খালটি খনন করা খুবই দরকার। খনন করতে পারলে যেমন ফিরে পাবে খালটি তার আগের যৌবন আর কৃষকেরা খালের পানি ব্যবহার করে জমিতে ফসল চাষ করতে পারবেন।

দাকোপ উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. তারিফ-উল-হাসান মুঠোফোনে খুলনা মেইলকে বলেন, খালটি সম্পর্কে আমি অবগত নয়। তবে যদি খালটি অবৈধভাবে দখল করে থাকে, তাহলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, অবৈধ দখলদার থাকলে তালিকা করে দখলমুক্ত করা হবে। এছাড়া খালটি খননের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সংশ্লিষ্ঠ আরো সংবাদ

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৪৯,৫৯৮
সুস্থ
১৪৩,৮২৬
মৃত্যু
৩,৩০৬
সূত্র: আইইডিসিআর

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৯৭৭
সুস্থ
২,০৭৪
মৃত্যু
৩৯
স্পন্সর: একতা হোস্ট