বসন্তের ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল রাস্তাঘাট : বন্দরে ৩নং সতর্ক সংকেত

প্রকাশিত: ২৭-০২-২০১৯, সময়: ০২:০৩ |

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা অঞ্চলে মঙ্গলবার ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বসন্তের এ ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল জেলাসহ খুলনা শহরের নিম্নাঞ্চল, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের কিছু এলাকা।

 

কোথায়ও কোথায়ও শিলা বৃষ্টি ও প্রচন্ড ঝড়ে ঘরবাড়ি বিধ্বস্তসহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।

 

কলারোয়াতে একজনের মৃত্যুসহ বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরায়। গাছ ও ঘর ভেঙে চাপা পড়ে নারী-শিশুসহ আটজন আহত হয়েছে বাগেরহাটে।

 

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারনে মংলা বন্দরে জাহাজে নিয়মিত খালাস বন্ধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌ বন্দরকে ২ নম্বর এবং সমুদ্র বন্দরকে ৩নং সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

 

খুলনা আঞ্চলিক আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ সিনিয়র আবহাওয়াবিদ মোঃ আমিরুল আজাদ বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌ বন্দরকে ২ নম্বর এবং সমুদ্রবন্দরকে ৩নং সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

 

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খুলনার কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই ভারী বৃষ্টিপাত বলা হয়ে থাকে, মাত্র ১২ ঘন্টায় ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সে হিসেবে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে খুলনা অঞ্চলে। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। আগামী বৃহস্পতিবার আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

সরেজমিন দেখা গেছে, কর্মব্যস্ত সকালের বৃষ্টিতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় শ্রমজীবী মানুষ। এসএসসি পরীক্ষার বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পরীক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত ‘রসায়ন’ ও ‘ব্যবসায় উদ্যোগ’ বিষয়ে পরীক্ষা ছিল গতকাল। বৃষ্টির কারণে তাৎক্ষণিক পানিবদ্ধতা ও যানবাহন সংকটে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর। এ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখা গেছে কয়েকজনকে।

 

সাতক্ষীরা : আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন জেলার কলারোয়ায় ঝড় ও শিলাবৃষ্টির মধ্যে পড়ে জামশেদ আলী (৭০) নামের বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল দুপুরে উপজেলার চন্দনপুর-কলারোয়া সড়কে এ ঘটনা ঘটে। জামশেদ আলী কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া ইউনিয়নের খাসপুর গ্রামের বাসিন্দা। মাত্র পাঁচ মিনিটের টর্নেডোর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কলারোয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা।

 

স্থানীয়রা জানান, জামশেদ আলী কলারোয়ার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় পড়ে যান তিনি। পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেননি তিনি। একপর্যায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

 

মঙ্গলবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিট থেকে ৮টা ৪৫ মিনিটের এ ঘূর্ণিঝড় টর্নেডোর আঘাতে কলারোয়ার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় সবক’টি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে জনজীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ।

 

মুক্তিযোদ্ধা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ হাবিবুল্লাহ বলেন, টর্নেডোর আঘাতে উড়ে গেছে স্কুলের চাল। এতে করে শ্রেণীকক্ষ এখন খোলা আকাশের নিচে। ক্লাস বন্ধ রয়েছে স্কুলটিতে। দিনভর গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে উপজেলাসহ এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।

 

উপজেলার তুলসীডাঙ্গার ব্যবসায়ী আবুল বাসার জানান, স্থানীয় গোগ মন্দিরের সামনের দুইশ’ বছরের প্রাচীন কালের সাক্ষী বটবৃক্ষটি টর্নেডোর ছোবলে উপড়ে গেছে।

 

কয়লা এলাকা থেকে রাণী ব্রিকসের মালিক কামরুল ইসলাম সাজু জানান, ইটভাটার কাঁচা ইটের একটিও আস্ত নেই। সব ইট গলে গেছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ আপাতত বন্ধ রয়েছে বলে জানান তারা।

 

বাগেরহাট : আমাদের মোংলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বজ্রমেঘ ঘনীভুত হওয়ার প্রভাবে মোংলা সমুদ্র বন্দরসহ সুন্দরবন উপকুলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। গত রবিবার বিকেল থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত তিন দিন থেমে থেমে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে মোংলা বন্দরে থাকা দেশী-বিদেশী বানিজ্যিক জাহাজের পণ্য-খালাস বোঝাই কাজ। ঝড়ো হাওয়ার কারনে মোংলা, পায়রা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার সমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

 

ঝড়ের কবলে পরে মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে একটি ড্রেজার ডুবেছে। মঙ্গলবার দুপুরে পশুর নদীর বিদ্যারবাহন খেয়াঘাট এলাকায় থাকা ড্রেজারটি প্রচন্ড ঝড়ে কাত হয়ে যায়। এ সময় ভেতরে পানি ঢুকে ড্রেজারটি ডুবে যায়। তবে এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ড্রেজার মালিক। বাদল আনলোডিং নামের ড্রেজারটি ডুবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ড্রেজার মালিক মাসুম।

 

মোংলা বন্দরের হারবার মাস্টার দুরুল হুদা জানায়, চ্যানেলের হারবাড়িয়া, বর্হিনোঙ্গর ও জোটিতে সার-ক্লিংকার ও মেশিনারিজ মালামালসহ ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারনে এসব জাহাজে নিয়মিত খালাস কাজ চলছে না।

 

 

এদিকে, সমুদ্র উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে অবস্থানকারী শুঁটকির জন্য মাছ আহরণকারী ট্রলারসহ শত শত মাঝিমাল্লা সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলার চরাঞ্চলের বিভিন্ন খালে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির কারনে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

 

আমাদের বাগেরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণ, শিলা বৃষ্টি ও ঝড়ে শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় গাছ ও ঘর ভেঙে চাপা পড়ে নারী-শিশুসহ আটজন আহত হয়েছে। ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা পাকা প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে ও ভেঙে গেছে অসংখ্য গাছপালা। আহতদের উদ্ধার করে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝড়ে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় জেলার চারটি উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়ায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে স্ব স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসন।

 

আহতরা হলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ খানপুর গ্রামের শেখ জাকির হোসেন (৫২), মাদ্রাসা ছাত্র ফরিদ হোসেন (১৩), সাফিয়া বেগম (২৪) রাফমিন (৪), ময়না (১৫), লাকি বেগম (৩২), হাবিব (৪৮) এবং আফরিনা (৩৫)। বাগেরহাট পৌরসভার হাড়িখালি, সদর উপজেলার খানপুর, ষাটগম্বুজ, কাড়াপাড়া, ডেমা, বেমরতা ও রাখালগাছি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে অন্তত শতাধিক কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

 

খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির ফহম উদ্দিন বলেন, প্রবল বর্ষণ ও শিলা বৃষ্টির সাথে ঝড়ে দক্ষিণ ও উত্তর খানপুর গ্রামের অন্তত ৩০ কাঁচা-পাকা বসত ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘর ও গাছ চাপা পড়ে শিশু নারীসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝড়ে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়েছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রচন্ড ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও গাছপালা পড়ে গেছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 

বাগেরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোঃ নাজমুল হাসান বলেন, দুপুরে ঝড়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের বেশকিছু খুঁটি ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় বাগেরহাট সদর, কচুয়া, ফকিরহাট ও রূপসা উপজেলায় সকাল থেকে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নে তিনটি, ফতেপুর, সায়েড়া ও বিষ্ণুপুর গ্রামে অন্তত ছয়টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে। আমাদের একাধিক দল বিদ্যুৎ সংযোগের মেরামত কাজে মাঠে নেমেছে।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আফতাব উদ্দিন বলেন, এই বৃষ্টিতে কৃষির তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বরং এই বৃষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন ফসল আম, কাঁঠাল ও বোরো ধানের দারুণ উপকার হয়েছে।

সিএন্ডবি বাজার প্রতিনিধি জানান, চুলকাঠিতে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী ঝড়ে বাগেরহাট সদর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ খানপুর গ্রামে এ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্বল্প সময়ের এ ঝড়ে আবুবক্কর নামের এক ব্যক্তির মেয়ের পা ভেঙেছে, জাকির নামের এক ব্যক্তির হাত ভেঙেছে, লাকি বেগমের মেয়ে মাথা ফেটেছে এবং আসরিনা নামের এক ক্যান্সার রোগী ঘরে চাপা পড়েছিল। ঘর ভেঙে পড়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

তথ্য টি শেয়ার করুন
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

Leave a comment

উপরে