খুলনায় ধর্ষণের পর ব্যাংক কর্মকর্তা মেয়ে ও বাবাকে হত্যায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশিত: ১৭-০৭-২০১৯, সময়: ০১:০০ |

খুলনা নগরীতে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে গণধর্ষণের পর তার বাবা ইলিয়াছ আলীসহ হত্যাকান্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ৫ আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরের আদেশ দিয়েছে আদালত।

 

মঙ্গলবার দুপুরে খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ৩নং ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ মহিদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

 

পারভীন সুলতানাকে গণধর্ষণের পর হত্যা মামলার ৬৫ পৃষ্ঠা ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যা মামলার ৫২ পৃষ্ঠার রায় প্রায় দেড় ঘন্টাব্যাপী পাঠ করেন এ বিচারক। বহুল আলোচিত এ হত্যাকান্ডের ৩ বছর ৯ মাস ২৭ দিন পর গতকাল রায় ঘোষণা হলো।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো লবণচরা থানাধীন বুড়ো মৌলভীর দরগা রোডের বাসিন্দা শেখ আব্দুল জলিলের ছেলে সাইফুল ইসলাম পিটিল (৩০), তার ভাই মোঃ শরিফুল (২৭), মোঃ আবুল কালামের ছেলে মোঃ লিটন (২৮), অহিদুল ইসলামের ছেলে আবু সাইদ (২৫) ও মৃত সেকেন্দারের ছেলে মোঃ আজিজুর রহমান পলাশ (২৬)। এদের মধ্যে শরিফুল পলাতক বাকী ৪ জন কারাগারে রয়েছেন।

আদালতের রায়ে, পারভীন সুলতানাকে গণধর্ষণের অপরাধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (৩) ধারায় ৫ আসামিকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যার দায়ে ৫ আসামিকে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় প্রত্যেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড, লাশ গুমের অপরাধে অতিরিক্ত ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন স্পেশাল পিপি এড. ফরিদ আহমেদ। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষকে সহায়তার জন্য ছিলেন বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার পক্ষে এড. কাজী সাব্বির আহমেদ, এড. মোমিনুল ইসলাম, এড. তসলিমা খাতুন, এড. কুদরত ই খুদা।

 

আদালত সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকান্ডের মামলায় ২১ জন ও গণধর্ষণের মামলায় ২৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। আসামিদের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ২ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে লোমহর্ষক এ হত্যাকান্ডের বর্ণনা রয়েছে। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ৩নং ট্রাইব্যুনালে মামলাটির যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) শুরু হয়।

 

মামলার তদন্ত চলাকালে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ৫ জনের মধ্যে ৪ জন গ্রেফতার হয়। এছাড়াও গ্রেফতার করা হয় পিটিলের স্ত্রী আসমা খাতুন, নোয়াব আলী গাজী ও আসলাম মিস্ত্রি নামের একজন সন্দেহভাজনকে। তাদের মধ্যে লিটন ও সাঈদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে উঠে আসে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের ঘটনা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ দু’জন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করেছিলেন তৎকালীন খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রট মোঃ ফারুক ইকবাল ও আয়েশা আক্তার মৌসুমী।

 

আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বলে, ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন অফিসে আসা-যাওয়ার পথে আসামিরা কু-প্রস্তাবসহ নানাভাবে যৌন হয়রানি করতো। এর প্রতিবাদ করায় ঘটনার দিন রাতে বাড়ির দেয়াল টপকে ভিতরে প্রবেশ করে ৫ আসামি। এরপর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পারভীনের বাবাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পাশের রুমে থাকা পারভীনকে ৫ জন মিলে গণধর্ষণের পর হত্যা করে সেফটি ট্যাংকির মধ্যে বাবা ও মেয়ের মরদেহ ফেলে দেয়। পরে ঘরে লুটতরাজ চালিয়ে পালিয়ে যায় তারা। সেদিন বিকেলে বুড়ো মৌলভীর দরগা এলাকায় একটি চা-দোকানে বসে তারা পরিকল্পনা করেছিলো। এরপর নৃশংস এ ঘটনার পর তারা লায়ন্স স্কুলের সামনে এসে একটি চা-দোকানে কিছু সময় থেকে চলে যায়। পারভীন সুলতানাদের বাড়িতে যাওয়ার আগে আসামিরা স্থানীয় দোকান থেকে কনডম কিনে নিয়েছিলো। এছাড়া পারভীন সুলতানাকে গণধর্ষণের পর তারা বাবাকেসহ হত্যার পরে মানষিক অস্থিরতার কারনে আসামি আবু সাইদ ওই ঘরের সোফার পাশেই মল ত্যাগ করেছিলো। পৃথক দু’টি মামলায় ৪৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, পুলিশের তদন্ত ও দু’আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে অভিযুক্ত ৫ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালতের বিচারক তার অবজারবেশনে বলেন।

 

উল্লেখ্য, কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে এক্সিম ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে উত্ত্যক্ত করতো এলাকার কয়েকজন বখাটে সন্ত্রাসী। তাদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদের কারনে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে গণধর্ষণ ও তার পিতা ইলিয়াস চৌধুরীকেসহ হত্যা করা হয়। নগরীর লবণচরা থানাধীন বুড়ো মৌলভীর দরগা এলাকার ৩নং গলির ঢাকাইয়া হাউজ এ.পি ভিলা নামের বাড়িতে ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নৃশংস এ খুনের ঘটনা ঘটে। বাবা ও মেয়েকে হত্যার পর বাড়ির ভিতরে সেফটি ট্যাংকির মধ্যে লাশ ফেলে দেয় খুনিরা। পরে তারা ওই ঘরের টাকা পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটে পালিয়ে যায়।

 

এ ঘটনায় লবণচরা থানায় পারভীন সুলতানার ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব বাদী হয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলা দায়ের করেন (নং-০৩)। পারভীন সুলতানাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে ২২ সেপ্টেম্বর আরও মামলা দায়ের হয় (নং-০৫)। হত্যাকান্ডের সাড়ে ৬ মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ৯ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই মোঃ কাজী বাবুল খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। এছাড়া ধর্ষণের মামলায় একই বছরের ২৪ মার্চ আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হয়। এ দু’টি মামলার চার্জশীটভুক্ত ৫ আসামিরা হলেন বুড়ো মৌলভী দরগা এলাকার সাইফুল ইসলাম পিটিল, মোঃ লিটন, আবু সাইদ, মোঃ শরিফুল ও মোঃ পলাশ।

 

মামলার বাদী নিহত পারভীন সুলতানার ভাই ও ইলিয়াস চৌধুরীর ছেলে রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে আমিসহ আমার পরিবার সন্তুষ্ট। এখন রায় কার্যকর হলে বোন ও বাবার হত্যার বিচারের পরিপূর্ণতা পাবো।

 

স্পেশাল পিপি এড. ফরিদ আহমেদ বলেন, এ রায় দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ ধরনের অপরাধ করার পূর্বে এ রায় অপরাধীদের মনে করিয়ে দিবে বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীর শাস্তি পেতেই হয়।

 

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনার সমন্বয়কারী এড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, মামলা দাখিলের পর থেকে আমরা এ মামলা দু’টি পরিচালনায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেছি। তাছাড়া সংস্থার পক্ষ থেকে বাদী পক্ষকে সর্বাত্মক আইনী সহায়তা প্রদান করেছি। মামলার দায়ে দোষী ব্যক্তিদের ফাঁসির আদেশে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপরে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বেড়ে গেল।

তথ্য টি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a comment

উপরে